
শিমুল রেজা,
মুসলমান সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিভিন্ন কামারপল্লীগুলোয় নেমে এসেছে কর্মব্যস্ততার ভিন্ন এক আমেজ। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য প্রয়োজনীয় দা, ছুরি, চাপাতি, বটি ইত্যাদি চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত,চারদিকে ঠুং ঠাং শব্দে ও হাপরের বাতাসে কামারশালার ছোট্ট চুল্লিতে গনগন করে উঠছে কয়লার আগুন। আর সেই আগুনের উত্তাপে পোড়া লাল লোহা দক্ষ কারিগরের হাতুড়ির ঘায়ে রূপ নিচ্ছে ধারালো ছুরি, দা, বঁটি ও চাপাতি।

কোরবানির পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় এসব সরঞ্জাম তৈরিতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন কামাররা। চুয়াডাঙ্গা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কামার পরিবার, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্যবাহী লোহা শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদুল আযহা মৌসুমই তাদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ততম এবং লাভজনক। চুয়াডাঙ্গা জেলার এই শিল্প শুধু স্থানীয় জীবিকার উৎস নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সরেজমিনে দেখা যায়, চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কামারশালাগুলোতে পুরোনো অস্ত্র শান দেওয়া ও নতুন সরঞ্জাম তৈরির ধুম পড়েছে। অনেকেই আগে ভাগেই নিজেদের ব্যবহৃত দা ও ছুরি ধার করাতে নিয়ে আসছেন। দোকানের সামনে সারি সারি ছুরি, চাপাতি, দা ও বঁটি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আকার ও ওজন অনুযায়ী প্রতিটির দামও ভিন্ন। ছুরি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়, দা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকায় এবং বঁটি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। পশু জবাইয়ের ছুরি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। তবে কেজি উপরের নির্ভর করে দাম নির্ধারণ করা হয়। চাহিদা বুঝে অনেক কারিগর আবার কাস্টম ডিজাইনেও সরঞ্জাম তৈরি করছেন। ফলে প্রতিটি কামারশালায় ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কার্পাসডাঙ্গা বাজারে কামারপল্লী কারিগর জিয়ারুল রহমান জানান, কয়লা ও লোহার দাম অনেক বেশি। তাই তৈরিকৃত সরঞ্জাম বিক্রি বেশি হলেও লাভ কম হয়। ৮ দিন পর মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তর ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। তাই এ উৎসবকে কেন্দ্র কামারদের ব্যস্ততা বেড়েছে অনেক। কাজের চাপে যেন দম ফেলার সময় নেই সকাল থেকে রাত গভীর পর্যন্ত কাজ করেও সব অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি দিতে হিমশিম খেতে হয়।

কারিগর আলামিন হোসেন অভিযোগ করে বলেন, তাদের পরিশ্রমের তুলনায় মজুরি অনেক কম। সারাদিন আগুনের পাশে বসে থেকে কাজ করতে হয়, এর ফলে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কার্পাসডাঙ্গা কমে যাচ্ছে কামার সম্প্রদায়ের মানুষ। বাধ্য হয়ে পৈত্রিক পেশা পরিবর্তন করছেন অনেকে।

কারিগর সুমন আলী বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই পেশায় ছিলেন। আমরাও করছি। কিন্তু এখনকার তরুণরা আগ্রহ হারাচ্ছে। কারণ, কষ্ট অনেক, আয় তুলনামূলক কম। তবে ব্যয়ের দিক দিয়ে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। কারিগররা জানান, লোহার পাত, কাঠের হাতল, কয়লা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ। এতে লাভ কমে গেছে সরকারি সহায়তা পেলে হয়তো এই পেশা আবার মর্যাদা ফিরে পাবে বলে জানান অনেকেই।

দামুড়হুদার ডুগডুগি বাজারে কামারশালায় নতুন দা, ছুরি কিনতে আসা শরিফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির সাথে কথা হলে তিনি জানান, কোরবানির ঈদের আর সময় নেই, তাই পছন্দ মতো দা, ছুরিসহ অন্যান্য উপকরণ কিনতে এসেছেন। তবে আগের তুলনায় নতুন দা, ছুরির দাম বেশি বলে জানালেন তিনি।
অপরদিকে ক্রেতা রাজু বলেন, ঈদ উপলক্ষে দা, চাপাতি ও ছুরির দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে। ছুরি শান দেওয়ার জন্য ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে কাজের গুনাগুনের ওপর ভিত্তি করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

কারিগরদের মতে, যদি সরকার প্রশিক্ষণ এবং স্বল্পসুদের ঋণের ব্যবস্থা করতো, তাহলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আরও উন্নতমানের ও অধিক পরিমাণে পণ্য উৎপাদন সম্ভব হতো। তাই সময় এসেছে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের। আসন্ন কোরবানির ঈদ যেমন কামারদের ব্যস্ততা বাড়িয়েছে, তেমনি তাদের মুখে এনে দিয়েছে সাময়িক হাসি। তবে এই হাসিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রয়োজন সুসংগঠিত উদ্যোগ ও কার্যকর সহায়তা।

















