
শিমুল রেজা
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার শিবনগর গ্রামে একদিল শাহ নামক পীরের একটি ভুয়া মাজার প্রতিষ্ঠা করেছে। যা কিনা একই ব্যক্তির নামে। এই নতুন মাজারের নির্মাণাধীন ভবনের কাজ এখনো চলমান রয়েছে। আর এই মাজারটি দেখাশোনা করছেন চন্দ্রবাস গ্রামের ছানোয়ার ও তরিকুল। আর প্রকৃত মাজারটি আলমডাঙ্গা উপজেলার গোবিন্দপুর ও বেতবাড়িয়া গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত পুরাতন এই মাজারটি দেখাশোনা করছেন ইউনুস আলী।
দামুড়হুদা উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামের মরহুম তৈয়বের ছেলে মজনু শাহ (৬০), চন্দ্রবাস গ্রামের দুরুনের ছেলে ছানোয়ার (৪৫), মুন্সীপুর গ্রামের রফিকুল (৪৫), চন্দ্রবাস গ্রামের সুলতানের ছেলে তরিকুল (৩৫) ও মরহুম কাজেমের ছেলে নজির (৫০), শীবনগর গ্রামের জালালের ছেলে রহমান (৪০) এবং অজ্ঞাত আরও শতাধিক ভন্ড মাজারের নামে ভক্তদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে বার্ষিক ওরশের নামে এখানে নানা ধরণের মাদক সেবনসহ অবৈধ কাজ পরিচালিত হচ্ছে। প্রতারণার শিকার হয়েছেন এখানকার ও দুর দূরান্তের ভক্তবৃন্দ মানুষ। এলাকাবাসীর তোপের মুখে নিষেধ উপেক্ষা করে গড়ে তুলেছেন একদিন শাহর নকল আরেকটি মাজার। এখানে একদিল শাহর মরদেহ ছাড়াই মাজারের আদলে একটি পাকা কবর তৈরি করে জাঁকিয়ে বসেছে মাদক সেবী ও মাদক ব্যবসায়ীরা।
দামুড়হুদা উপজেলার শীবনগর গ্রামের ডিসি ইকো পার্কের সামনের এ আমবাগানে অসৎ উদ্দেশ্যে একদিল শাহ নামক একজন পীরের কথিত মাজার আছে এমন মিথ্যা প্রচারণা ছড়িয়ে আরও একটি মাজার তৈরী করে সেখানে মাদকের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। এ যেন ছোটবেলায় পড়া পাঠ্যবইয়ের সেই আলোচিত “মজিদ ও লালসালু”র ঘটনাটিকে মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে পীর একদিল শাহ নামীয় মাজার শরীফ আলমডাঙ্গা উপজেলার দক্ষিণ গোবিন্দপুর ও বেতবাড়ীয়া গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত এবং জনশ্রুতি রয়েছে এদেশে আগমনের একপর্যায়ে আনুমানিক ৮’ শ বছর আগের কোন এক সময় উনি পরলোকগমন করেন এবং তার ভক্ত অনুরাগীরা এখানে নিয়ে তার মরদেহ সমাহিত করেন। প্রতি বছরের ২০ চৈত্র সেখানে ঔরশ অনুষ্ঠিত হয় এবং পীর একদিল শাহর ভক্ত অনুরাগীরা দেশের দূরদূরান্ত থেকে এসে সেই মাজার কেন্দ্রীক তাদের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। কয়েক’শ বছরের প্রাচীন কিন্তু বিশাল একটা অসত্থ গাছের নিচে ছোট পরিসরে আধ্যাত্মিক এ সাধকের মাজার অবস্থিত। এই মনের বাসনা পূরণে মাজারে কেউ কোন সিন্নি প্রদান কিংবা মানত করলে সেটা পূরন হয় মর্মে লোকমুখে বহুল প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে মাজারের এই প্রাচীন অসত্থ গাছে কয়েকশ’ জ্বীন বাস করে। এগ্ৰামের অনেকেই স্বপ্নে তাদের দেখেছেন বলেও এ প্রতিবেদককে জানান। ভারতে জন্ম নেয়া এই সাধকের বংশধরগন ভারতে বসবাস করছেন বলে জানা যায়। অন্যের জমি জবর দখলের কুমতলবে শীবনগর গ্রামের আলোচিত আম বাগানের গাছ কেটে লুট করে এ জমিতে একদিল শাহর আরও একটি কথিত মাজার তৈরি করা হয়েছে। একই ব্যক্তির পৃথক দুটি স্থানে দুটি মাজার হয় কখনো ? ঘৃন্য এ কাজে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ইন্ধনের অভিযোগ রয়েছে।
আলমডাঙ্গার দক্ষিণ গোবিন্দপুর গ্ৰামের একদিল শাহর মাজারের খাদেম ঐ গ্ৰামের মৃত আফিল উদ্দিন মন্ডলের ছেলে ইউনুস আলী বলেন, পর্যায়ক্রমে তার দাদা বাবার পর সে নিজে ২০ বছর ধরে খাদেম হিসাবে মাজারের সেবকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। মাজারের প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে তিনি জানান, সঠিক সময়কাল কেউ বলতে পারেন না। তবে লোকমুখে শুনেছেন আনুমানিক ৮’শ বছর আগে পীর একদিল শাহ মারা যান এদেশেই । সেসময় তার অনুসারীরা এখানে নিয়ে এসে তার একজন গুণমুগ্ধ ভক্তের দান করা জমিতে তার মরদেহকে সমাহিত করা হয়। সেই থেকে অদ্যাবধি এখানেই প্রতিবছর তার ওফাৎ দিবস হিসাবে পবিত্র ওরস শরীফ পালিত হয়ে আসছে ২০ চৈত্র।
একই গ্ৰামের নিয়ামত খাঁর ছেলে ফিরোজ খাঁ দীর্ঘদিন এই মাজারের সেবক হিসাবে কাজ করেছেন। তিনিও অভিন্ন ভাষায় বলেন তার দাদা-বাবার সূত্রে এবং ছোটবেলা থেকেই তিনি এই মাজারে আসা যাওয়া করতেন। তার জোর দাবি এই মাজার ছাড়া একদিন শাহর আর কোথাও কোন মাজার নেই। এক ব্যক্তির দুটি মাজার হতে পারে না বলেও তিনি জোর মন্তব্য করেন। যে বা যাহারা উপজেলার শিবনগরে একদিল শাহর নামে যে কথিত মাজারটি প্রতিষ্ঠা করেছেন, আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এই এলাকার একজন গ্রামবাসী এবং একজন ভক্ত অনুরাগী হিসাবে আমি জোর দাবি করছি এর বাইরে কোন মাজার নাই। চুয়াডাঙ্গার সকল ধরনের প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো অবিলম্বে এই ভন্ড মাজার পূজারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
গোবিন্দপুর গ্রামের মোসলেম খার ছেলে কালু মন্ডল বলেন তিনি ৩০ বছর আগে এই গ্রামে এসেছেন সেই থেকে দেখছেন এটাই একদিল শাহর মাজার। এখানেই দূর দূরান্ত থেকে একদিল শাহর হাজার হাজার ভক্ত অনুসারী আসেন এবং নির্ধারিত সময়ে ওরস পালন ও দোয়া প্রার্থনা করেন।
অপরদিকে জেলার দামুড়হুদা উপজেলার শিবনগরে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত একদিল শাহর কথিত মাজারের পাশের বিশাল বাগানের মালিক পার্শ্ববর্তী চন্দ্রবাস গ্রামের মৃত মওলা বক্সের ছেলে বাহালুল হক জানান, আমার পৈতৃক ১৮ বিঘা জমিতে আমবাগান রয়েছে। আমি এ পর্যন্ত কোনদিন দেখেনি বা শুনিনি যে এখানে একদিল শাহর মাজার আছে। অতি সম্প্রতি এলাকার কিছু ভন্ড ও নেশাখোর ব্যাক্তি কিছু বাঁশ টিন, মিস্ত্রী ও লাঠি সোটা এবং দেশিয় অস্ত্র এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এলাকায় একটা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে আমার বাগানের সন্নিকটে রাতের আঁধারে একটি মাজার তৈরী করে ভন্ডামি শুরু করেছে। অথচ একদিল শাহ আনুমানিক ৮’শ বছর আগে মারা গেছেন। এবং উনার মাজার আলমডাঙ্গা উপজেলার দক্ষিণ গোবিন্দপুর গ্রামে অবস্থিত। এখানে মাজার তৈরির উদ্দেশ্য মাদক সেবন ও মাদক ব্যাবসায় করা। আর এটা যেহেতু ভারতীয় সীমান্তের একেবারেই নিকটবর্তী। তাই ভারত থেকে গাজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা সহ বিভিন্ন নেশাজাত দ্রব্য আনা নেয়া ও বিপণন করা অত্যন্ত সুবিধাজনক। এছাড়া এই কথিত মাজারের পাশে তারা গাঁজা গাছ লাগিয়েছে। যা এখনও রয়েছে। নাটুদহ ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের মেম্বার খলিলুর রহমানও অভিন্ন দাবি করে জানান, এই মাজারটা সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে এখানে বসানো হয়েছে। এলাকার কিছু বখাটে, নেশাখোর ও বাটপার এবং ভন্ড লোকজন শুধুমাত্র মাদক ব্যবসার স্বার্থে এটা করেছে। তিনি অবিলম্বে এই কথিত ও অবৈধ মাজার উচ্ছেদের জন্য জোর দাবি জানান।









