শিমুল রেজা,
চুয়াডাঙ্গায় ২টি সংসদীয় আসনে বিএনপির নির্বাচনী ফলাফলে চরম হতাশা নেমে এসেছে। বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, জেলার ২টি আসনের মধ্যে ২টিতেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা (দাঁড়িপাল্লা প্রতীক) বিজয়ী হয়েছেন। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চুয়াডাঙ্গা ১ আসনে মনোনয়ন এবং সুনির্দিষ্ট কৌশলী ষড়যন্ত্র’-এর কারণেই বিএনপির এই শোচনীয় পরাজয়। বিএনপির চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনের আগে মনোনয়ন দেয়া নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ছিল। তৃণমূলের পরীক্ষিত নেতাদের উপেক্ষা করে মনোনয়ন দেয়া বা দলের নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। যার খেসারত দিতে হয়েছে ভোটের মাঠে।
বিশেষ করে ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ভোটের প্রচারণায় সামনের সারিতে রাখায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়হীনতার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা জনপ্রিয় এই দলটির জেলা কাঠামোর দীর্ঘদিনের ক্ষতগুলোকেই জনসমক্ষে নিয়ে এল।
চুয়াডাঙ্গা জেলায় জনপ্রিয় দল হওয়া সত্ত্বেও সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দুই প্রার্থীর ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে সাংবাদিকদের জানান চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত সহিদুল ইসলাম বিশ্বাসের মেয়ে ও কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সদস্য মিলিমা ইসলাম বিশ্বাস (মিলি) এবং জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ মিল্টন।
কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সদস্য মিলিমা ইসলাম বিশ্বাস চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনে বিএনপি প্রার্থীর বিপর্যয়ের কারণ উল্লেখ করে বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণবিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর চুয়াডাঙ্গায় কিছু বিপথগামী বিএনপি নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে গণহারে চাঁদাবাজি, লুটপাট ও রাহাজানিতে নেমে পড়েছিল। ওই বিপথগামী নেতা-কর্মীরা কারা এবং কার সঙ্গে চলাফেরা করে, তা সবাই জানে। তারা নির্বিচারে যার-তার কাছে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করেছেন। তাদের নিবৃত্ত করা বা তাদের বিরুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ওই বিপথগামী নেতা-কর্মীরাই সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের প্রার্থী শরীফুজ্জামান শরীফের পক্ষে ভোট চেয়ে বেড়িয়েছেন এবং ভোটের মাঠে কাজ করেছেন, যা সাধারণ ভোটাররা ভালো চোখে দেখেননি। সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা ভোটের কার্যক্রমে সক্রিয় থাকায় দলটিকে মাশুল দিতে হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “আমার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর করেছে বিএনপির বিপথগামী কিছু উশৃঙ্খল নেতা-কর্মী। এ ব্যাপারে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি, নেওয়া হয়নি তাদের বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা। যার ফলে ওই সব নেতা-কর্মী দলীয়ভাবে আসকারা পেয়ে আরও দলবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়েছেন, যার প্রভাব ভোটে পড়েছে।”
মিলিমা ইসলাম আরও বলেন, “আমার বাবা চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাবার ১৮ জন ভাই সব সময় নিঃশব্দে বিএনপির ভোটে কাজ করে এসেছেন। এবার তারা দলীয় কাজে নামেননি। কারণ, দলীয় প্রার্থী তাঁদের প্রয়োজন মনে করেননি।”
এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় বিএনপির গ্রুপিংয়ের রাজনীতি কেউ সমন্বয় করার চেষ্টা করেনি। ফলে বিভক্ত গ্রুপগুলোকে প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামানো সম্ভব হয়নি। ভোটের কয়েক দিন আগে নিষ্ক্রিয় নেতা-কর্মীদের বিশ্বাস না করায় তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের প্রার্থীর জেতার ক্ষেত্রে ‘ওভার কনফিডেন্স’ ছিল, যার কোনো ভিত্তি ছিল না।”
তিনি আরও বলেন, “চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলায় যেসব চিহ্নিত নেতা-কর্মী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন, তাদের বেশিরভাগই সমাজে অপরাধী। তাদের চেহারা দেখে সাধারণ ভোটাররা বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। গত দুই বছর জেলা সম্মেলন হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়া এবং ব্যক্তি হিংসা ও অভিমানে এ জেলায় বিএনপি অস্তিত্বসংকটে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।”
জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ মিল্টন বলেন, “দীর্ঘদিন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জেলা বিএনপি গুছিয়ে উঠতে পারেনি। প্রতিপক্ষ জামায়াত অনেক আগে প্রার্থী ঘোষণা করলেও বিএনপি প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে অনেক দেরিতে। ফলে দলীয় সমন্বয় দ্রুত করা যায়নি এবং ভোটাররা ভরসা পাননি। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল মেটানো না সম্ভব হওয়া অন্তঃকোন্দল।”
তিনি বলেন, “৫ আগস্টের চাঁদাবাজরা ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকায় নির্বাচনে এর প্রভাব পড়েছে। যারা কারণ ছাড়াই সাধারণ ভোটারদের ওপর নির্যাতন করেছিলেন, তারা ভোট চাইতে গেলে ভোটাররা ক্ষুব্ধ হন। ভোটারদের মনে আস্থা অর্জন করতে না পারাই হারের প্রধান কারণ।”
মিল্টন বলেন, “দলের ভুলে বিএনপির দুজন প্রার্থী পরাজিত হননি, নেতা-কর্মীদের কারণে পরাজিত হয়েছেন। চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। কেন্দ্রীয় বিএনপি ভোটারদের মন বুঝতে পারেনি, যার খেসারত দিতে হয়েছে।”
দেরিতে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কিছু নেতা জামায়াতবিরোধী বক্তব্যে বেশি মনোযোগী ছিলেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “ভোটারদের চাওয়া বুঝতে না পারা ছিল বড় ভুল।”
আওয়ামী লীগের ভোট প্রসঙ্গে তিনি জানান, “আওয়ামী লীগের অনেকে টাকা দাবি করে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যোগাযোগ করলেও অবিশ্বাসের কারণে তাতে সাড়া দেওয়া হয়নি।” আরও বেশকিছু কারণে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের শরীফুজ্জামান শরীফ ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের প্রার্থী এবং বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) জিততে পারেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

















