
শিমুল রেজা,
শতকোটি টাকার বিনিয়োগ সত্ত্বেও দেশের ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডে স্বস্তি ফিরছে না। আধুনিকায়নের নামে স্থাপিত নতুন যন্ত্রপাতিতে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। ফলে চলতি ২০২৫-২৬ আখ মাড়াই মৌসুমে মিলের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন আখচাষিরা।
মিল সূত্র জানায়, মাত্র চার দিনের (৯৬ ঘণ্টা) কার্যক্রমে ৫৩ ঘণ্টাই আখ মাড়াই বন্ধ রাখতে হয়েছে। একের পর এক যান্ত্রিক সমস্যায় মিল থেমে যাওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া জেলার হাজারো আখচাষির ওপর।
নির্ধারিত সময়ে আখ মাড়াই না হওয়ায় মাঠ ও মিল চত্বরে পড়ে থাকা আখ রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে আখের ওজন ও গুণগত মান কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি চিনি আহরণের হার কমে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন আখচাষিরা।
গত ৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৫-২৬ মৌসুমের আখ মাড়াই কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। আধুনিক নতুন ইউনিটে মাড়াই শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পুরোনো কারখানায় কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০ ডিসেম্বর প্রথম দফার ক্রাশিং শেষ হওয়ার পর ১ জানুয়ারি নতুন ইউনিট চালু করা হলে শুরু হয় যান্ত্রিক বিপর্যয়। মিল হাউস, বয়লার ও টারবাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশে ত্রুটির কারণে একের পর এক বন্ধ থাকে মিলের কার্যক্রম।
মিলের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ৬ ঘণ্টা, ১ জানুয়ারি টানা ২৩ ঘণ্টা, ২ জানুয়ারি ৬ ঘণ্টা, ৩ জানুয়ারি ১৫ ঘণ্টা এবং ৪ জানুয়ারি প্রায় তিন ঘণ্টা আখ মাড়াই বন্ধ ছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জায়গা সংকটে ওজন শেষে পাওয়ার ট্রলিতে আনা আখ মাটিতে ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। আবার মিলের নিজস্ব ট্রাক্টরে আনা আখ দীর্ঘ সময় গাড়িতেই পড়ে থাকছে। এতে আখ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের লোকসানের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়েছে।
কেরু কর্তৃপক্ষ সুত্রে জানা যায়, ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কেরু চিনিকলের আধুনিকায়ন করতে ২০১২ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় ব্যালেন্সিং মর্ডানাইজেশন রেনোভেশন অ্যান্ড এক্সপেনশন (বিএমআরই) প্রকল্পের কাজ। ২০১২ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় প্রথমে ৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। পরবর্তীতে সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ১০২ কোটি ২১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। আর প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি। তবে সাব-কন্ট্রাক্ট নেয় ভারতের একটি সুগার ইকুইপমেন্ট কোম্পানি, যারা মাঝপথে কাজ ফেলে চলে যায়। পরে দায়িত্ব পায় উত্তম এনার্জি লিমিটেড। নির্ধারিত দুই বছরের প্রকল্প সাত দফা সময় বাড়িয়েও ১৩ বছরে শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি দেখানো হয়েছে মাত্র ৭৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
সম্প্রতি একনেক প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। আইএমইডির সুপারিশ অনুযায়ী, এর বাইরে আর সময় বা ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই।
এদিকে ট্রায়াল রানের সময় মিল থেকে বিকট শব্দ ও অপরিশোধিত বর্জ্যপানির কারণে দর্শনাবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বাতাসে ছাই উড়ে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে চিনিকলের আশপাশের হাজারো মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাব্বিক হাসান জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নতুন ইউনিটে আখ মাড়াই চালুর চেষ্টা চলছে। যান্ত্রিক সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে কেরুর বিএমআরই প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ফিদা হাসান বাদশার বক্তব্য পাওয়া যায়নি




















