হারুন অর রশিদ রাজু,
সেদিন যদি আমি সাহসের সাথে আইনি কলমটা না চালাতাম, তবে আজ আমরা এক ভিন্ন বাংলাদেশ দেখতাম। আওয়ামী লীগ আমলে সেই সময়কার যে পৈশাচিক পরিস্থিতি ছিল, তাতে তারেক রহমানকে সেদিন জেলের ভেতর মেরেই ফেলা হতো। ওর হাত-পা ভেঙে গুঁড়ো করে দেয়া হচ্ছিল। আমি নিচ থেকে সব দেখছিলাম ওদের চোখে মুখে ছিল খুনের নেশা। দীর্ঘ ১৬ বছর বুকের ভেতর চেপে রাখা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কাঁপা গলায় কথাগুলো বলছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীন। এটি কেবল ২০০৮ সালের একটি আইনি লড়াইয়ের গল্প নয়, এটি এক বিচারপতির রক্তক্ষরণ, এক মায়ের (বেগম খালেদা জিয়া) অশ্রুভেজা বিশ্বাস আর সত্যের পথে চলতে গিয়ে দীর্ঘ নিঃসঙ্গ দেড় দশকের এক নির্বাসনের করুণ আখ্যান। তুমি আমার বড় ছেলের মতো, ওকে দেখো, এক মায়ের আমানত রক্ষায় বিচারপতি জয়নুল আবেদীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজ আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, "বেগম জিয়া আমাকে নিজের বড় ছেলের মতো স্নেহ করতেন। তিনি আমাকে একবার নয়, একাধিকবার বলেছিলেন জয়নুল, তুমি কিন্তু আমার বড় ছেলের মতো। ওরা তো ছোট, তুমি ওদের দেখো। এমনকি তিনি আমাকে পরম মমতায় কথা দিয়েছিলেন জয়নুল, গেট রেডি, আমি তোমাকে কিন্তু দেশের প্রেসিডেন্ট বানাবো। সেদিন আমি তোমারে আদালত কক্ষে অসহায় মায়ের সেই আমানতের আর্তনাদ বাজছিল। আমি জানতাম, সেদিন যদি আমিন না দিতাম, তবে তারেক রহমান জেলের অন্ধকার কুঠুরি থেকে আর জ্যান্ত বের হতে পারত না। ২০০৮ যখন বিচারালয়ে কাঁপছিল ক্ষমতার রক্তচক্ষু সেদিন আপিল বিভাগের সেই তপ্ত দুপুরে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পাশে বসা অন্য দুই বিচারপতির চোখে ছিল সীমাহীন আতঙ্ক। বিচারপতি আবেদীন বলেন, "ওরা আমার কানে ফিসফিস করে বলছিল স্যার, আমাদের চাকরি থাকবে না। ওপর থেকে মেসেজ আছে, ও যেন কোনোভাবেই জামিন না পায়, ও পালিয়ে যাবে। আমি ওদের সাফ বলেছিলাম ও পালাবে কিনা তা সরকার দেখবে। কিন্তু আমি বিচারকের শপথের মর্যাদা রক্ষা করব। বিচারকের মতো কাজ করেন। আইন অনুযায়ী জামিন পেলে আমরা দিতে বাধ্য। নিজের ক্যারিয়ার বা জীবনের তোয়াক্কা না করে সেদিন তিনি একাই লড়েছিলেন প্রবল স্রোতের বিরুদ্ধে। ১৬ বছরের জীবন্ত সমাধি ও রাজকীয় বঞ্চনা। আইন মেনে সত্য রায় দেয়ার অপরাধে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনকে গত ১৬ বছর এক জীবন্ত নরকবাস করতে হয়েছে। যোগ্যতা আর জ্যেষ্ঠতায় সবার ওপরে থাকলেও তাকে প্রধান বিচারপতি হতে দেয়া হয়নি। তার চোখের সামনে কনিষ্ঠদের ওপরের আসনে বসিয়ে তাকে প্রতিদিন তিলে তিলে অপমান করা হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "শেখ হাসিনা সরকার আমাকে ১৬ বছর নিগৃহীত করেছে। শুধু এই জন্য যে কেন আমি সেদিন তারেক রহমানকে মুক্তি দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ যখন দেখি সেই তারেক রহমানই দেশের মানুষের আশা-ভরসা, তখন মনে হয় আমার সেই ত্যাগ আর চোখের জল সার্থক হয়েছে। আমার চেয়ে বেশি খুশি কেউ হবে না। তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা ও আগামীর স্বপ্ন প্রতিহিংসার আগুনে পুড়লেও বিচারপতি আবেদীনের হৃদয়ে আজ কোনো ঘৃণা নেই। তিনি এখন কেবল স্বপ্ন দেখেন এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে কোনো বিচারককে আর ইশারায় রায় লিখতে হবে না। তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আকাশ ছোঁয়া প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "তারেক রহমান আজ দেশের আশার আলো। আমি তাঁর সাথে একবার সাক্ষাৎ করার তীব্র ইচ্ছা পোষণ করছি। আমি চাই তাঁর সাথে পরামর্শ করতে, তাঁকে শুভকামনা জানাতে। আমি দোয়া করি সে যেন এক সফল রাষ্ট্রনায়ক হয়। সে যেন প্রতিহিংসার বদলে সুশাসন উপহার দেন। দেশের এই, ক্রান্তিলগ্নে একজন অভিজ্ঞ অভিভাবক হিসেবে দেশ সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার সক্ষমতা ও ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বলেন, "আমি কোয়ালিফাইড লোক। বেগম জিয়া আমাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। আজ দেশ চাইলে আমি সেই দায়িত্ব নিতে পারি, তবে সবকিছুই তারেক রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিলাম। বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের এই জবানবন্দি আজ কেবল সংবাদ নয়, বরং বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক হিরণময় দলিল হয়ে থাকবে।।