শিমুল রেজা
চুয়াডাঙ্গা জেলার সকল এলাকায় এবার বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বেশীর ভাগ জমির ধান পরিপক্ষ পর্যায়ে পৌঁছায় ধান কাটা শুরু হয়েছিল। প্রচলিত নিয়ম মোতাবেক ধান কেটে জমিতেই দু-একদিন রেখে শুকিয়ে নিয়ে কৃষকরা বাড়ীতে নিয়ে ধান মাড়ানো -ঝরানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। কারন জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারনে প্রায় বাড়িতে এখন ধান শুকানোর মত উঠোন তেমন অবশিষ্ট নেই। এজন্য কৃষকরা ধান কেটে দু'একদিনের জন্য ক্ষেতে রেখে দেয় শুকানোর জন্য। এবারও সে লক্ষ্যে ধান কেটে মাঠে বিছিয়ে রেখেছিল। টানা বৃষ্টিতে কৃষকের স্বপ্নের ইরি-বোরো ধান পানিতে ভাসছে। কৃষকদের ওপর নেমে এসেছে প্রকৃতির নির্মম পরিহাস। একমাত্র সম্বল বোরো ফসল চোখের সামনে ভাসছে কৃষকের স্বপ্ন দিশেহারা হাজারো কৃষক পরিবার। আগাম অতিবৃষ্টি, ক্ষেতের শুকনো ধান ভিজে জবজবা পানিতে থাকার ফলে ধানের উজ্জল রং নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্যে ধান বিক্রি করতে হবে এবার। শ্রমিকের অভাব জেলার স্থানীয় বাজার গুলোতে দুই তিন দিন যাবত প্রতিটি শ্রমিকের মজুরি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক না পাওয়ায় মাঠের পাকা ধান চোখের সামনে পানিতে নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার সব এলাকার মাঠ গুলোতে একই চিত্র। পাকা কাটা ধান বৃষ্টির পানিতে ভাসতে দেখা যায়। এতে কৃষকদের লাখ লাখ টাকা ক্ষতির দুঃচিন্তায় থাকতে হচ্ছে। কোথায়ও কৃষককে বৃষ্টির পানিতে ভেসে থাকা পাকা ধান মাঠ থেকে তুলে ক্ষেতের আইলে অথবা সড়কে রাখতে দেখা যায়। এতে করে বেশ কিছু ধান ঝরে যাচ্ছে এবং খড় পচে যাচ্ছে। আবার ভ্যানগাড়ি করে বাড়িতে ধান নিয়ে যাওয়া, মাড়াই ও শুকানো নিয়েও তাদেরকে দুঃচিন্তায় থাকতে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে,চলতি বছর ৩৫ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ইরি-বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। গত এক সপ্তাহ পূর্বেও জেলায় ফসলি জমিতে ইরি-বোরো ধানের জমিতে পাকা সোনালী ধান বাতাসে দোল খেতে দেখা যায়। অন্য বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে প্রতিটি এলাকায় ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলনের আশা করেন কৃষকরা। কিন্তু ফসল কাটার মূহুর্তে অবিরাম বৃষ্টি তাদের সোনালী ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন হুমকিতে ফেলে দেয়। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টি বন্ধ না হলে জেলার অধিকাংশ কৃষকের ইরি-বোরো ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ুলগাছি ইউনিয়নের মাঠপাড়া গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলামকে গবরা মাঠ থেকে বৃষ্টির মধ্যে তার ৬০ শতাংশ জমির কাটা ধান পানি থেকে তুলে পাশের সড়কে রাখতে দেখা যায়। তিনি বলেন, চারদিন পূর্বে ধান কেটে জমিতে রেখেছেন। টানা বৃষ্টিতে কাটা ধান ঘরে তুলতে পারেননি। বাধ্য হয়ে আজকে ধান তুলে বাড়িতে নেয়ার চেষ্টা করছি। এতে করে অনেক ধান ঝরে যাচ্ছে। আবার ধান মাড়াই ও শুকানো নিয়েও তাকে দুঃচিন্তায় থাকতে হচ্ছে। কুড়ুলগাছি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মাঠের পর মাঠ কৃষকদের পাকা ধান কোথায়ও মাঠে কেটে রাখা হয়েছে, আবার কোথায় পাকা ধান বাতাসে হেলে পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কৃষক জিয়া রহমান জানান, গত চারদিন আগে ধান কাটার পর বৃষ্টিতে কাটা ধান ভাসছে। ধানের বীজ বপন, পানি দেয়া, সার, কীটনাশক প্রয়োগ ও সব মিলিয়ে ৩৫ হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে। ধান ঘরে তুলতে না পারলে আমাকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
কৃষক আব্দুল গনি জানান, গত তিন মাস ধরে ধান রোপণ থেকে শুরু করে পানি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, সার ও কীটনাশক প্রয়োগের পর পাকা ধান কাটার সময় শুরু হয় টানা বৃষ্টি। পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে দুঃচিন্তায় দিন কাটাতে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, ‘প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছে কৃষি বিভাগ, ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে অ্যাডভোকেট সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ রাসেল ও চুয়াডাঙ্গা -২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল আমিনকে বিষয়টির প্রতি সুনজর দিয়ে দেখার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এলাকার কৃষি সমাজ। কৃষকদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের তালিকা করে সরকারি সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান কৃষকদের। চুয়াডাঙ্গায় এই দুর্যোগ শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও এক বড় চ্যালেঞ্জ।